Thu. Jan 20th, 2022

ঝিনাইদহ নিউজ

সবার আগে সর্বশেষ

সুনামগঞ্জের হাওরে নানা প্রতিকূলতায় তিন ইউএনওর করোনা যুদ্ধ

1 min read

ঝিনাইদহ নিউজ ডেস্ক: সুনামগঞ্জের নামটা এলেই সবার প্রথমে আসে অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, অনুন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, হাওরাঞ্চল, বর্ষায় থৈ থৈ পানি, দুর্গম সীমান্ত এলাকা, হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ, জেলার একমাত্র বোরো ধান, জলমহাল ও বালুমহাল। জেলার ১১ উপজেলায় যারাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দায়িত্বে আসেন তাদের এই সব চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখেই কাজ করতে হয়। নারী-পুরুষ সবাইকে।

এত সব চ্যালেঞ্জের সঙ্গে বর্তমানে চলছে করোনা পরিস্থিতি। ফলে চরম ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে সবাইকে। ১১ উপজেলার প্রত্যেক ইউএনওই করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের যথাসাধ্য কাজ করে যাচ্ছেন।

কিন্তু জেলার সুনামগঞ্জ সদর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ ও দোয়ারাবাজার উপজেলার তিনজন নারী ইউএনও দেশে করোনাভাইরাস শনাক্তের পর থেকে করোনা পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছেন দায়িত্বের সঙ্গে। এই পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত করোনাকে জয় করছেন। চরম ঝুঁকি নিয়ে যাচ্ছেন মানুষের কাছাকাছি। তাদের প্রত্যেকেরই পরিবার আছে, আছে সন্তানও। তারপরও তাঁরা প্রত্যেকেই বলেছেন, সন্তান পরিবারের চেয়েও রাষ্ট্রের দেওয়া দায়িত্ব তাদের কাছে বড়।

করোনা পরিস্থিতির মধ্যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বিভিন্ন প্রণোদনা, সুযোগ সুবিধা এবং ত্রাণ সামগ্রী সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে দায়িত্ব নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সহায়তায় তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করছেন। এমনকি সরকারের দেওয়া গাড়িতে করেও তাদের বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছেন সাধ্যমতো।

করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও আগাম বন্যায় ফসল রক্ষায় বাঁধের তদারকি, ধান কাটার শ্রমিক সংকট সমাধান করা, ধান তোলা শেষে লটারির মাধ্যমে কৃষক বাছাই করা, সরকারের দেওয়া আড়াই হাজার টাকার তালিকা প্রণয়ন করা, এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, করোনার মধ্যে ব্যবসায়ীরা যাতে অবৈধভাবে ফায়দা না নিতে পারে সেই লক্ষে বাজার মনিটরিং করা, সর্বোপরি করোনা শুরুর সময় লকডাউন কার্যকর করা, এবং কারো করোনা পজিটিভ হলে তাদের খুঁজে বের করে কমিউনিটি থেকে আলাদা করে আইসোলেশনে নেওয়া, রোজার মধ্যে সকাল থেকে অফিস করতে হয়েছে এমনকি জরুরি প্রয়োজনে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ কিংবা করোনায় কেউ আক্রান্ত হলে তাৎক্ষণিক ওই এলাকায় পৌঁছাতে হয়। এমন অনেক এলাকা আছে নদীপার হয়ে নৌকা নিয়ে যেতে হয়। আবার মোটরসাইকেলে করেও ওইসব এলাকায় যাওয়া লাগে। এই তিন নারী ইউএনও চরম ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে সেবা দিচ্ছেন। এর জন্য এলাকার মানুষের প্রশংসাও কুড়িয়েছেন।

তবে তিনজন নারী ইউএনও বলছেন, এই সংকটের সময়ে মানুষের উপকারে আসাটাই বড় কথা। তার পাশাপাশি সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে রাষ্ট্রের দেওয়া দায়িত্ব পালন করছেন। সেইসঙ্গে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক আব্দুল আহাদের নির্দেশে যখন যা করা লাগে তাঁরা করছেন।

এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ সদরের ইউএনও ইয়াসমিন নাহার রুমা বলেন, ‘করোনার ঝুঁকি থাকে সব সময়। কিন্তু রাষ্ট্র আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে সেটি যথাসাধ্যভাবে পালন করার চেষ্টা করছি। সাধারণ মানুষের জন্য সরকারের দেওয়া সুযোগ-সুবিধাগুলো যোগ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি সতর্কতার সঙ্গে। করোনা পরিস্থিতির শুরুর পর থেকে আমরা মাঠে আছি। প্রথম দিকে লকডাউন নিশ্চিত করা। এর পর করোনা আক্রান্ত মানুষকে চিহ্নিত করে আইসোলেশনে নেওয়া এবং পুরো এলাকাকে নিরাপদ রাখা। কারণ মানুষ আমাদের ওপর ভরসা করে, বিশ্বাস করে। যদিও ঘরে আমার দুই মেয়ে আছে। একজনের বয়স ১২, অন্যজনের বয়স ৪। তারা চায় মায়ের সঙ্গে কিছু সময় কাটাতে। কিন্তু এমনও হয় সকালে বাসায় মেয়ে দুইটাকে ঘুমে রেখে যাই আবার এমনও হয় রাতে বাসায় ফিরে দেখি তারা ঘুমাচ্ছে।’

‘আর সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার নয়টি ইউনিয়ন। তার মধ্যে দুর্গম এলাকা বেশি। এ ছাড়া উপজেলার অন্যান্য কাজগুলো তো করতেই হয়। বেশি গুরুত্ব দিতে হয় হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের দিকে। এমনও হয়েছে গভীর রাতেও বাঁধে যেতে হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও এবার শ্রমিক সংকট কাটিয়ে একমাত্র বোরো ধান কৃষক ঘরে তুলেছে। এবং লটারি করে যোগ্য কৃষকদের কাছ থেকে ধানকেনাও নিশ্চিত করেছি। ভয় থাকবে এমনকি নিজেরাও আক্রান্ত হওয়ার চরম ঝুঁকি আছে। তারপরও রাষ্ট্রের দেওয়া দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করব।’

দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ইউএনও জেবুন্নাহার শাম্মী করোনা পরিস্থিতির মধ্যে চ্যালেঞ্জ নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটাকে আমি চ্যালেঞ্জ মনে করি না। এটা আমার দায়িত্ব। রাষ্ট্র বিশ্বাস করে আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে মানুষের পাশে সেবা নিয়ে দাঁড়াতে। আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি। করোনা পরিস্থিতির পর বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা, স্বচ্ছতার সঙ্গে সরকারের দেওয়া ত্রাণ অসহায় মানুষের মধ্যে পৌঁছে দেওয়া ছিল মূল কাজ।’

তবে কিছু কিছু ব্যাপারে একটু ঝামেলা হয়েছে জানিয়ে জেবুন্নাহার শাম্মী বলেন, ‘করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে হাসপাতালে আইসোলেশনে পাঠাতে একটু ঝামেলা হয়েছে। দেখা গেছে, করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি হাওরে মাছ ধরতে গেছেন তখন গাড়ি দিয়ে বা মোটরসাইকেল দিয়ে হাওরে যেতে হয়েছে। অথবা উনি হাওর থেকে বাজারে গেছেন। তো তাদেরকে বুঝিয়ে হাসপাতালে পাঠাতে হয়েছে। আর নারী রোগী হলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পাঠাতে হয়েছে।’

করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে জেবুন্নাহার শাম্মী বলেন, ‘আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সব সময়ই থাকে। কারণ যেকোনো কিছু হলেই উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে মানুষের যতটা সম্ভব কাছাকাছি যেতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ভয় পেলে সাধারণ মানুষ কী করবে? তবে কাজ শেষে রাতে বাসায় গেলে আমার আড়াই বছরের মেয়েটা পাগল হয়ে যায়, সারাদিন মাকে দেখে না। তাই, বাসায় গিয়ে নিজেকে পরিষ্কার করে মেয়েটাকে কোলে নেই, তখন মনে হয় আমার মেয়েটার যেন কিছু না হয়। আবার পরের দিন সকালে ঝুঁকি নিয়েই কাজে যাই।’

দোয়ারাবাজারের ইউএনও সোনিয়া সুলতানা বলেন, ‘দোয়ারাবাজার উপজেলাটিও দুর্গম। হাওর আছে, সীমান্ত এলাকা আছে, টিলা আছে, বোরো ধান ক্ষেত আছে, বালু-পাথর সবই আছে, সব কিছুই দেখতে হয়। পাহাড়ি ঢলও বেশি হয় দোয়ারাবাজারে। এই উপজেলার বেশির ভাগ এলাকা দুর্গম। সেইসঙ্গে করোনা পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য দুর্গম এলাকায় প্রায়ই যেতে হয়। তবে এসব এলাকার মানুষ খুব একটা সচেতন না। তাদের করোনার ভয়াবহতা বোঝানোর চেষ্টা করলেও বুঝতে চায় না। তারপরও তাদের সঙ্গে কাজ করতে হয়। কেউ আক্রান্ত হলে তাদের হাসপাতালে পাঠাতে এলাকায়ও যাওয়া লাগে। সেই সঙ্গে সরকারের দেওয়া বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এলাকার চেয়ারম্যান-মেম্বার নিয়ে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। উপজেলায় স্বেচ্ছাসেবক টিম করে দিয়েছি। তারাও আমাদের সঙ্গে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করে যাচ্ছে।’

সোনিয়া সুলতানা বলেন, ‘আমার সাড়ে ৪ বছরের একটা মেয়ে আছে। কিন্তু পরিবার আর মেয়ের থেকেও দেশের দায়িত্ব বড়। ভয় পাই না। ভয়কে জয় করেই কাজ করে যাচ্ছি।’

তবে তিন ইউএনওই বলেন, সাধারণ মানুষ যদি সরকারের দেওয়া বিধি-নিষেধ মেনে চলে তাহলে মানুষের মধ্যে করোনার সংক্রমণ কম হবে।

সুনামগগঞ্জ সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায়, এখন পর্যন্ত করোনায় জেলায় ১১৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন। তার মধ্যে ৬০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। আর এখনো ৫৩ জন আইসোলেশনে আছেন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *